খাদ্য তালিকায় বিপ্লব ঘটাবে সাদা ভুট্টা

সাদ ভুট্টা

আমাদের নিত্যদিনের খাদ্য তালিকায় ধান ও গমের প্রাধান্যই বেশি। তাই ধান ও গমের উপর চাপও অনেক বেশি। প্রতিনিয়ত দেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে দেশে আবাদ যোগ্য জমির পরিমাণ কমে যাচ্ছে। একই সঙ্গে বর্ধিত জনসংখ্যার জন্য বাড়ছে খাদ্যের চাহিদা। এই বর্ধিত জনসংখ্যার ধান ও চালের চাপ কমাতে পারে সাদা ভুট্টা।

দেশে খাদ্য নিরাপত্তা ও ধান চালের ওপর চাপ কমাতে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষিতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. জাফর উল্লাহ তিন বছর ধরে গবেষণা চালিয়েছেন। সাদা ভুট্টা খেতে সুস্বাদু এবং পুষ্টি সমৃদ্ধ। আটা হলুদ ভুট্টার চেয়ে মিহি হওয়ায় পৃথিবীর বহু দেশে সাদা ভুট্টা প্রধান খাদ্য হিসেবে সমাদৃত।

সাদা ভুট্টা থেকে পরোটা, নানরুটি, পিঁয়াজু, সবজি পাকোড়া, চিকেন রোল, শর্মা, মিষ্টি তেলপিঠা, কেক, পাস্তা, জিলাপিসহ মুখরোচক সব খাবার তৈরি হয়। আবার চাল ও গমের আটার খাবারের তুলনায় এতে পুষ্টিগুণও কম নয়। বরং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বেশি। সেই সুবাদে টেকসই খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা বিবেচনায় এসব খাবার হয়ে উঠতে পারে ধান-গমের বিকল্প।

বিজ্ঞানীদের মতে, এ দেশের মানুষের খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা জোরদার করতে ধান ও গমের পাশাপাশি সাদা ভুট্টার ব্যবহার বাড়ানো প্রয়োজন। তাহলে ভাতের ওপর চাপ কমবে। গম আমদানির পরিমাণও কমবে। আর সে জন্য যথাযথ প্রচার ও পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি।

পৃথিবী জুড়ে পশু-পাখির খাদ্য হিসেবে হলুদ ভুট্টার ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। তবে মানুষের খাবার হিসেবে সাদা ভুট্টার উপযোগিতা অনেক। এর বাজারমূল্যও হলুদ ভুট্টার চেয়ে অনেক বেশি। সাদা ভুট্টায় স্নেহ ও আমিষের পরিমাণও তুলনামূলক বেশি থাকে। এর তেল উন্নত দেশে বহুল ব্যবহৃত। বিশেষ করে সাদা ভুট্টা দিয়ে তৈরি করা যায় হরেক রকমের সুস্বাদু খাবার। 

অধ্যাপক ড. মো. জাফর উল্লাহ বলেন, খাদ্য হিসেবে ধান-গমের বিকল্প হিসেবে সাদা ভুট্টা গ্রহণ করা যেতে পারে। পুষ্টিমান বিবেচনায় অনেকাংশে চালের চেয়ে সাদা ভুট্টা ভালো। প্রতি ১০০ গ্রাম সাদা ভুট্টায় চালের চেয়ে আমিষের পরিমাণ ১.৪৮ গ্রাম বেশি রয়েছে। এছাড়া চর্বি ১.৮২ গ্রাম, লৌহ ১.২৪ গ্রাম, জিংক ০.১৯ গ্রাম, পটাসিয়াম ৬৪ গ্রাম এবং সোডিয়াম ২৮ গ্রাম বেশি রয়েছে। অন্যান্য গুণাগুণও প্রায় চালের কাছাকাছি। তাই সাদা ভুট্টা চালের ওপর বাড়তি চাপ কমাতে ভালো বিকল্প হতে পারে।

পরোটা

পরোটা তৈরিতে প্রয়োজনীয় উপকরণগুলো হলো- সাদা ভুট্টার আটা ১ কাপ, গমের ময়দা ২ কাপ, গুঁড়াদুধ ১ টেবিল চামচ, ইস্ট আধা চা চামচ, লবণ স্বাদমতো, চিনি ১ চা চামচ, ভোজ্য তেল আধা চা চামচ। প্রস্তুত করতে একটি পরিষ্কার পাত্রে সাদা ভুট্টার আটা, ময়দা, গুঁড়াদুধ ও লবণ মেশাতে হবে। সিকি কাপ তেল দিয়ে মাখাতে হবে। এরপর ১ কাপ পানি দিয়ে খামির তৈরি করতে হবে। খামিরটুকু ৮-১০টি ভাগ করতে হবে। প্রতিটি অংশ গরম তাওয়ায় সেঁকে প্রস্তুত করতে হবে একেকটি পরোটা।

নানরুটি

প্রয়োজনীয় উপকরণগুলো হলো- সাদা ভুট্টার আটা ১ কাপ, গমের ময়দা ২ কাপ, চিনি ২ চা চামচ, ইস্ট ২ চা চামচ, দুধ ১ কাপ, পানি ১ কাপ, ভোজ্য তেল ২ টেবিল চামচ, গুঁড়াদুধ দেড় টেবিল চামচ ও লবণ স্বাদমতো। প্রস্তুত করতে পরিষ্কার পাত্রে মৃদু গরম পানিতে ১০ মিনিট ভিজিয়ে রাখতে হবে। এরপর উপাদানগুলো ভালোভাবে মাখাতে হবে। ইস্ট মিশ্রিত পানি ও দুধ মিশিয়ে ১০ মিনিট মথে নিতে হবে। এরপর তেল দিয়ে খামির তৈরি করতে হবে। বাতাস যেন না লাগে এমন জায়গায় খামির ভেজা কাপড় দিয়ে তিন-চার ঘণ্টা ঢেকে রাখতে হবে। খামির ফুলে উঠতেই আবারও মথে নিতে হবে। এবার খামির খাটি ১০-১২ ভাগ করে একেকটি ১০ সেন্টিমিটার পুরু করে রুটি বেলতে হবে। এরপর তাওয়ায় সেঁকে মাখন লাগালেই হয়ে যাবে সুস্বাদু নানরুটি।

পিঁয়াজু

সাদা ভুট্টার আটা আধা কাপ, চালের গুঁড়া আধা কাপ, ডালের বেসন আধা কাপ, পিঁয়াজ কুচি আধা কাপ, চারটি কাঁচা মরিচ কুচি, আদা বাটা আধা চামচ, হলুদ আধা চা চামচ, ধনিয়া ১ চা চামচ, কালিজিরা ১ চা চামচ, তেল ও লবণ পরিমাণমতো মিশিয়ে আঠালো করে মেখে নিতে হবে। গরম তেলে এপিঠ-ওপিঠ করে ভাজলেই প্রস্তুত হবে মচমচে পিঁয়াজু।

সবজি পাকোড়া

পছন্দমতো সবজি চাকা চাকা করে কেটে নিতে হবে। পরিষ্কার পাত্রে সাদা ভুট্টার আটা ও চালের গুঁড়া তিন টেবিল চামচ করে, ডালের বেসন ৫ টেবিল চামচ, টেম্পুরা পাউডার ১ টেবিল চামচ, আদা ও হলুদ আধা চা চামচ, কালিজিরা ১ চা চামচ এবং প্রয়োজনমতো লবণ ও পানি নিয়ে ভালোভাবে মেশাতে হবে। এরপর সবজির চাকগুলো ওই মিশ্রণে ডুবিয়ে গরম তেলে ভেজে ট্রেতে ন্যাপকিন পেপারে রাখতে হবে।

চিকেন রোল

সাদা ভুট্টার ২ কাপ আটা, আধা কাপ ময়দা, দুটি ডিম ও তেল ২ কাপ নিতে হবে চিকেন রোল বানাতে। সব উপাদান পরিষ্কার পাত্রে ভালোভাবে মিশিয়ে নিতে হবে। এরপর পরিমাণ মতো পানি মিশিয়ে তৈরি করে দুই ঘণ্টা রেখে দিতে হবে। একটি ননস্টিক ১৫ সেন্টিমিটার তাওয়ায় পাতলা কাপড়ের টুকরো হালকা তেলে ভিজিয়ে লাগিয়ে নিতে হবে। উনুনে তাওয়া গরম করে চামচ গোলা দিয়ে রুটির মতো সেঁকে নিতে হবে। এরপর সেই রুটি দিয়ে বানাতে হবে রোল। এই পরিমাণ গোলায় ৪০টি রোল তৈরি করা যেতে পারে।

তেলপিঠা

তেলপিঠা বানাতে ২ কাপ সাদা ভুট্টার আটা, ১ কাপ ময়দা, আধ কাপ বেকিং পাউডার মিশিয়ে প্রয়োজনীয় পরিমাণ তেলে বাদামি করে ভেজে নিতে হবে।

কেক

কেক তৈরির প্রয়োজনীয় উপকরণগুলো হলো- আধা কাপ ময়দা, আধা কাপ সাদা ভুট্টার আটা, ডিম ২টি, চিনি ২ কাপ, তেল আধা কাপ, দুধ আধা কাপ, বেকিং সোডা আধা চা চামচ ও কোকা পাউডার দেড় চা চামচ।

এছাড়াও নানা ধরনের খাবার তৈরিতে সাদা ভুট্টার ব্যবহার ক্রমেই বাড়ছে।

আলু ক্ষেতে মিষ্টি কুমড়া চাষ

আলু ক্ষেত

আলু ক্ষেতে মিষ্টি কুমড়া চাষ

একই জমিতে একই সঙ্গে পর্যায়ক্রমে ২ টি বা ৩ টি ফসল চাষ করলে একদিকে যেমন বাড়তি ফসল থেকে বাড়তি লাভ হয়, তেমনি কোন একটি ফসলের ক্ষতি হলেও অন্যোন্য ফসলের উৎপাদন দিয়ে পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব।আজ কৃষকরা একই জমিতে একই সঙ্গে দু-তিনটি ফসল চাষ করে ব্যাপক সাফল্য পাচ্ছেন। আলু ক্ষেতে মিষ্টি কুমড়া চাষ সে প্রচেষ্টারই দৃষ্টান্ত। নীচে আলুর সঙ্গে মিষ্টি কুমড়া চাষ পদ্ধতি আলোচনা করা হলো-

জমি ও মাটি

আলু চাষাবাদের জন্য উঁচু জমি উত্তম। কারণ এ ধরনের জমিতে পানি থাকে না। বেলে-দোআঁশ বা দোআঁশ মাটিতে আলুর ফলন ভালো হয়। মিষ্টি কুমড়া চাষের জন্য একই ধরণের জমি ও মাটি প্রয়োজন।

আলু বপন

আলুর ফলন ভালো পেতে হলে ডিসেম্বর জমি ভালো করে জমি চাষ-মই দিয়ে মাটি ঝুরঝুরে করে নিতে হয়। প্রয়োজনীয় মাত্রার সার দিয়ে আলুবীজ বপন করতে হবে। এবার গাছের উচ্চতা ৬ সেমি হলেই নিড়ানি দিয়ে কান্দি দিতে হবে।

মিষ্টি কুমড়ার বীজ বপন

আলুর বপনকাজ শেষ করার ২০ থেকে ২৫ দিনের মধ্যে মিষ্টি কুমড়ার বীজ বপন করতে হবে। সেচ দেওয়ার জন্য আলুর দুই কান্দির মাঝে সামান্য উঁচু করে মাদা তৈরি করে নিতে হবে। দুই কান্দির মাঝে ৪ থেকে ৫ হাত দূরে মিষ্টি কুমড়ার মাদা তৈরি করে নিতে হবে। মাদা কান্দির চেয়েও সামান্য উঁচু হবে। প্রতিটি মাদায় ৪ থেকে ৬টি বীজ পুঁতে বপন করতে হবে। এভাবে প্রতি শতাংশ জমিতে ১৭ থেকে ২০টি মাদা তৈরি করতে হবে।

আলু ওঠানোর সময়

আলু ওঠানোর সময়

আলু ফেব্রুয়ারী মাসে উঠানো যাবে। এ সময় বেড়ে ওঠা মিষ্টি কুমড়ার গাছ বেশি লম্বা হয়। তখন মিষ্টি কুমড়ার গাছগুলো পেঁচিয়ে গোল করে রেখে দিতে হবে। দু-একদিনে জমি থেকে আলু ওঠানোর কাজ শেষ হলে মিষ্টি কুমড়ার গাছগুলো পেঁচানো অবস্থা থেকে এদিক ওদিক ছড়িয়ে দিতে হবে। এতে গাছ চারপাশে সমানভাবে বাড়তে থাকবে। মিষ্টি কুমড়া গাছ ছড়িয়ে দেওয়ার সময় যাতে গাছগুলো ছিড়ে না যায় সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে।

আলু ওঠানোর পর

ক্ষেত থেকে আলু ওঠালে এমনিতেই মাটি মোটামুটি সমান হয়ে যায়। তবুও কোথাও উঁচু-নিচু তা হাত দিয়ে কিংবা কোদাল দিয়ে সমান করে দিতে হবে, যাতে সমান করে দেওয়া মাটিতে মিষ্টি কুমড়ার গাছ সহজেই বাড়তে পারে। আলু ওঠানোর পর জমির মাটির রস শুকিয়ে যায়। তখন রসের অভাব পূরণে সেচ দিতে হবে। জমিতে সেচ দেওয়ার পর গাছের গোড়ায় প্রতিটি মাদার জন্য ১০০ গ্রাম টিএসপি, ৫০ গ্রাম ইউরিয়া গোলাকার নালা করে দিতে হবে। গাছে সার যেন না লাগে সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে। এরপরও গাছের বৃদ্ধি কম হলে দুই থেকে তিন সপ্তাহ পরপর এক থেকে দুবার একই পরিমাণ ইউরিয়া সার গাছের চারপাশে নালা করে দিতে হবে।

মিষ্টি কুমড়ার  যত্ন

মিষ্টি কুমডার যত্ন।

গাছ বড় হলে গাছে ফুল আসতে থাকে। ফুল আসার সময় কোনো ধরণের কীটনাশক প্রয়োগ করা যাবে না। কারণ এ সময় বিভিন্ন ধরণের কীটপতঙ্গ ফুলে ফুলে উড়ে বেড়ায় এবং পরাগায়ন ঘটায়। যেসব মিষ্টি কুমড়া ক্ষেতে কীটপতঙ্গের সংখ্যা বেশি থাকে সেসব ক্ষেতে কুমড়ার সংখ্যাও বাড়ে। জানা থাকলে পুরুষ ফুলগুলোর পরাগরেণু স্ত্রী ফুলের গর্ভদন্ডে মাখিয়ে দিতে হবে। তবে বেশি ঠান্ডা বা শীত পড়লে এসবের প্রয়োজন পড়ে না। পুরুষ ফুলের মধ্য থেকে একটি শীষ বের হয়, যার দেহে অসংখ্য হলুদ রঙের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দানা থাকে। আর স্ত্রী ফুলের মধ্য থেকে বের হওয়া দন্ডটির মাথা চার ভাগে বিভক্ত থাকে। এ দুটি লক্ষন দেখে পুরুষ ও স্ত্রী ফুল চেনা যায়। মিষ্টি কুমড়া একটু বড় হতে থাকলে কুমড়ার নিচে খড়, আলুর শুকিয়ে যাওয়া গাছ ও কাপড় দিয়ে বেঁধে দিলে কুমড়া মাটিতে থাকলেও পচবে না। এ সময় কুমড়ার মাছি পোকা হতে পারে। মাছি পোকা হলে ১০ বর্গমিটার দূরে দূরে বিষটোপ রাখা যেতে পারে। এভাবে আলু ক্ষেতে মিষ্টি কুমড়া চাষ করলে প্রতি বিঘায় ৮০০ থেকে ৯০০টি মিষ্টি কুমড়া পাওযা যাবে।